মহা সড়ক নির্মাণ, হারিয়ে যাচ্ছে সবুজ চেনা জায়গা।

নিউজ ডেস্ক Apr 29, 2019 - Monday জলপাইগুড়ি 568


প্রায় সমস্ত বাধা কাটিয়ে উঠে এখন দিন রাত এক করে চলছে মহা সড়ক নির্মাণের কাজ। শিলিগুড়ি থেকে জলপাইগুড়ি হয়ে ধূপগুড়ি যাবার রাস্তায় প্রত্যেকেরই চোখে পড়ছে এই বিশাল কর্মকাণ্ড। যুদ্ধের গতিতে চলছে কাজ। সমগ্র রাস্তা জুড়ে কাজ করছেন প্রচুর মানুষ। ট্রাকে ট্রাকে বালি আনা হচ্ছে রাস্তার দু'পাশ ভরাইয়ের জন্য। প্রায় সব কটি নদীর উপর তৈরি হচ্ছে আবার সুবিস্তৃত দ্বিতীয় সেতু। কোথাও কোথাও আবার পুরনো রাস্তা ভেঙ্গে মহা সড়কের জন্য নির্মাণ হওয়া নতুন রাস্তা খুলে দেওয়া হয়েছে এই রুটের গাড়ি চলাচলের জন্য। সে রাস্তা দিয়ে জোর গতিতে চলছে গাড়ি। কিন্তু এদিকে রাস্তার কাজ চলায় মাঝেমধ্যেই বিশাল যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। লাইন করে দাঁড়িয়ে থাকছে সারি সারি গাড়ি। তবে পুরো রাস্তা জুড়েই মোতায়েন থাকছে বিভিন্ন থানার পুলিশ, তারাও যথাসম্ভব চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে রাস্তা সচল রাখবার। ২৪ঘন্টা পুলিশের হাইওয়ে পেট্রোল গাড়ি ছুটে বেড়াচ্ছে এ মাথা থেকে ও মাথা। একদিকে যেমন অনেকেই স্বপ্ন দেখছেন কবে খুলে দেয়া হবে এই মহাসড়ক! অবসান ঘটবে যানজট যন্ত্রণার। ছোট-বড় সমস্ত গাড়ি চলবে দ্রুত বেগে। দু'ঘন্টার রাস্তা পাড়ি দেওয়া যাবে দেড় ঘণ্টা বা তারও কম সময়ে।

তেমনি অন্যদিকে কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়েছে পরিবেশবিদ-দের। মহা সড়ক নির্মাণের জন্য রাস্তার দুই পাশে থাকা বহু বছর পুরনো গাছগুলি কাটা হয়েছে। ফলে হারিয়ে গেছে সবুজ। মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে পরিবেশের উপর। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গাছের ভূমিকা যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ সেটা এখন ক্লাস থ্রি ফোর-এর বাচ্চারাও খুব ভাল করেই জানে। কিন্তু তারপরও বইয়ের পাতার বাইরে এসে বাস্তবে নিজ এলাকার উন্নয়নের লক্ষ্যে কাটা হচ্ছে গাছ। একটি সমীক্ষা থেকে জানা যায়, সারা পৃথিবীতে প্রতি মিনিটে প্রায় ৫৫৬০০ টি গাছ কাটা হয়। বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনে বিজ্ঞানীরা বলেছেন, প্রতি বছরই কার্বন নিঃসরণের রেকর্ড ভাঙছে। পৃথিবীতে শীর্ষে থাকা কার্বন নিঃসরণকারী দেশগুলোর মধ্যে এখন ভারতবর্ষ অন্যতম।

তবে শুধুই কি গাছ! পরিবেশ বিদদের মতে, এই পুরনো গাছগুলি কাটার সাথে সাথে হারিয়ে যাচ্ছে বহু চেনা অচেনা পাখি ও পোকামাকড়।

যাদের বাসস্থান ছিল সেই পুরনো গাছগুলো। এছাড়াও বালি দিয়ে ভরাট করা হয়েছে রাস্তার পাশের নয়ানজুলি বা ছোট জলা ভূমি গুলো। ফলে শুধু বাসস্থান হারানোই নয় বেঘোরে মরতে হয়েছে এই নয়ানজুলির জলে বসবাসকারী ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বাসিন্দাদেরও। কিন্তু এদের কথা ক'জন ভাবছেন!

এই পরিস্থিতিতে এখন অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, তবে কি এই বিশাল সংখ্যক গাছ কাটার ফলেই এবার শীত জাঁকিয়ে বসাতো দূরের কথা, আগেই বিদায় নিল! আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের মতে, পর্যাপ্ত গাছ না থাকায় এবার থেকে ডুয়ার্সে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কমতে পারে। অন্যদিকে বাড়ছে তাপমাত্রা ও পরিবেশ দূষণের আশংকা।

তাই এই প্রশ্নও উঠেছে এখন, গাছ লাগান পরিবেশ বাঁচান স্লোগান টি কতটা প্রযোজ্য এই ক্ষেত্রে!

এছাড়াও মহাসড়ক নির্মাণের জন্য ভাঙা হয়েছে রাস্তার পাশের প্রচুর দোকানপাট, বাড়িঘর, মন্দির-মসজিদ। জাতীয় সড়ক নির্মাণ কর্তৃপক্ষের থেকে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষেরা পেয়েছেন টাকা। কিন্তু এদিকে বড় পুরনো গাছ ও দোকানপাট ভাঙ্গার সাথে সাথে চোখে চেনা বাজার ঘাট জায়গাগুলিও হারিয়ে গেছে। রাতারাতি পাল্টে যাচ্ছে পরিচিত জায়গা। রাস্তার দু'পাশে ছোট ছোট জনপদ গুলিতে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা বাজার ভাঙ্গাতে পরিণত হয়েছে এখন শুধুই ধু ধু প্রান্তরে। রানীর হাট মোড়, হুসুলুড় ডাঙ্গা, দোমহনী, তালমা, দশ দরগার মত আরও অনেক জায়গা এখন আর নেই বললেই চলে।

পরিবেশ প্রেমিক সংগঠনের তরফ থেকে ডঃ পার্থ প্রতিম জানান, রাস্তা তৈরি করতে গাছ কাটা হবে এই নিয়ে বিতর্ক অনেক দিনের। জনসংখ্যা বাড়ছে উন্নয়ন করতেই হবে মানুষের যাতায়াতের জন্য পথ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এর বিকল্প তো আর কিছু নেই, কারণ সমাজবিজ্ঞানীরাও মনে করেন মানুষ যেদিন থেকে আগুন জ্বালানো শিখেছে সেদিন থেকেই শুরু হয়েছে দূষণ। আমাদের সংগঠনের পক্ষ থেকে আমরা এটাই দাবি রাখছি উন্নয়নের পাশাপাশি সরকার যেন সঠিক পদক্ষেপ নেয় সবুজায়নের জন্য। শুধু গাছ লাগানোই নয়, তারপরও খেয়াল রাখতে হবে সঠিকভাবে পরিচর্যা করার যাতে গাছগুলোও বেঁচে থাকে ও বেড়ে উঠতে পারে। বিগত পাঁচ বছরে যে পরিমাণ গাছ লাগানো হয়েছে তার যদি ২৫ শতাংশও বেঁচে থাকত, তাহলে আমাদের পরিবেশ নিয়ে এত দুশ্চিন্তা করতে হত না।

জলপাইগুড়ি ফার্মাসিস্ট কলেজের প্রাক্তন অধ্যাপক বর্তমানে কলকাতার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় এর সাথে যুক্ত সীমান্ত ভট্টাচার্যী বলেন, আমার দোমহনী মোড়কে এখন আমিই চিনতে পারি না। কাজের সূত্রে থাকতে হয় কলকাতায়, বাসে করে ফিরছিলাম বাড়ি। কিন্তু দেখলাম আমার সেই চেনা স্বপ্নের জায়গায় বড় মোটা গাছটির নিচে সেই চায়ের দোকানটি আর নেই। কিন্তু আমি কখনই উন্নয়নের বিপক্ষে নই। প্রয়োজন ইকো ফ্রেন্ডলি সাসটিনেবল ডেভেলপমেন্টের।

ন্যাশনাল হাইওয়ে বিভাগ কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে জানানো হয়, যে পরিমাণ গাছ কাটা হয়েছে তার কয়েকগুণ বেশি গাছ লাগানো হবে। মহাসড়ক পুরোপুরি তৈরি হয়ে যাবার পর তৈরি হবে গ্রিন ওয়ে। তবে এই কাজ করা হবে রাজ্য সরকারের সাথে যৌথ উদ্যোগে। ইতিমধ্যেই যেসব জায়গায় পুরোপুরি ভাবে তৈরি হয়ে গেছে ফোর লেন সেখানে রাস্তার দুপাশে শুরু হয়েছে এই গাছ লাগানোর কাজ।

আপনাদের মূল্যবান মতামত জানাতে কমেন্ট করুন ↴

সবার আগে খবর পেতে , পেইজে লাইক দিন

আপনার পছন্দ

বিজ্ঞাপন
PMJOK

আরও খবর

বিজ্ঞাপন
PMJOK