লোকচক্ষুর আড়ালে শালবাড়িতে সতীর ৫১ পীঠের অন্যতম ভ্রামরী দেবীর মন্দির।

নিউজ ডেস্ক Apr 22, 2019 - Monday শালবাড়ি 905


কামাখ্যা কালীঘাটের মত শালবাড়ীর ভ্রামরী দেবীর মন্দিরও হতে পারতো প্রসিদ্ধ তীর্থস্থান। দেবী এখানে প্রচারের অভাবে এখনো রয়ে গেছে সেই অবহেলাতেই। কিন্তু দেবী তো সকলের মা। তাই মানুষ না জানলেও, ভ্রামরী দেবী লোক চক্ষুর অন্তরালে থেকেই উত্তরবঙ্গ বাসীকে আশীর্বাদ করে চলেছেন যুগ যুগ ধরে। দূর দূরত্ব থেকে বহু মানুষ সাধু-সন্ন্যাসীরা মাঝেমধ্যেই এখানে আসেন। নিজেরাই উদ্যোগ নিয়ে আয়োজন করেন পুজোর। ধুমধাম করে না হলেও, রাত জেগে চলে হোম যজ্ঞ চন্ডি পাঠ। সকলেই মনে করেন দেবী মা খুবই জাগ্রত এখানে। এলাকাবাসীরা জানান, বিশেষ দিনগুলোতে এখনো রাতের বেলায় শোনা যায় নুপুরের আওয়াজ। এমনও অনেক উদাহরণ আছে, অনেকেই আসেন দেবীর সামনে মানত করে তার আশানুরুপ ফল পেয়ে পূজা করতে। জানা যায় বেশ কিছু বছর আগে জিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার হেডকোয়ার্টার কলকাতা থেকে তাপস সাধ্য ও দিলীপ চৌধুরী নামে দুই অফিসার এসেছিলেন এই মন্দির পরিদর্শন করতে। শালবাড়ি বাসীকে বুঝিয়ে দিয়ে যান এই মন্দিরের গুরুত্ব। এলাকার এক বাসিন্দা ও মন্দির পূজা কমিটির অন্যতম সদস্য হিরু রায় শোনান তার মায়ের কাছে শোনা বহুদিন ধরে ঘটে চলা এই মন্দিরের সাথে সম্পর্কিত অলৌকিক সব কাহিনী। তিনি আরো জানান আজ থেকে প্রায় চল্লিশ বছর আগে এখানে এক মহারাজ আসেন। তখন তিনি ছোট, রীতিমত ভয় পেয়ে যান সেই মানুষটিকে দেখে। লাল কাপড় পরা মাথা থেকে পায়ে নেমেছে তার বিশাল মোটা জট। তিনি দীর্ঘদিন এই মন্দিরে থেকে পুজো করেন রাত জেগে করেন যোগ্য। সে সময় তিনি প্রথম দেখিয়ে দিয়ে যান তিনটি মোটা গাছের গুড়ির নিচে অবস্থিত পাথরে পরিণত হওয়া দেবীর বাঁ পা। এরপর শুধু পশ্চিমবঙ্গই নয়, ভারবর্ষের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এই মন্দিরে আসতে শুরু করেন বিভিন্ন সাধু সন্তরা। সে সময় বাইরে থেকে আসা মানুষেরা ফালাকাটা স্টেশনের দেওয়ালের গায়ে এঁকে রেখে যান মন্দিরের একটি ম্যাপ। আজও সেই ম্যাপ রয়েছে সেই স্থানেই। এই এলাকারই এক প্রবীণ নাগরিক নিরেন রায় বলেন, বহু বছর আগে একটি দুর্ঘটনা কে কেন্দ্র করে নির্দোষ থাকা সত্বেও একটি মামলায় ৪৫ জনের মধ্যে আমার নামও জড়িয়ে যায়। প্রাণ প্রনে জব করতে থাকি মা ভ্রামরী দেবীর। দেবীর এমন মহিমা, অদ্ভুতভাবে আমি বেরিয়ে আসতে পারি সেই মামলা থেকে। আর ফিরে এসেই মা কে নতুন প্রতিমা গড়ে দিয়ে জোড়া পাঠা বলি দিয়ে পুজো করি।



কথিত আছে দক্ষ রাজার কন্যা সতী তাঁর স্বামী মহাদেব শিবের অপমান সহ্য করতে না পেরে রাজার আয়োজন করা যজ্ঞের আগুনে নিজেকে আহুতি দেন। ফলে মহাদেব প্রচণ্ড রেগে যান আর লন্ডভন্ড করে দেন সেই যজ্ঞ। রুদ্ররূপ ধারণ করে পৃথিবী জুড়ে সতীর দেহ কাঁধে নিয়ে প্রচণ্ড প্রলয় তান্ডব নৃত্য করতে থাকেন। ফলে পৃথিবীতে শুরু হয় এক ভয়ংকর দূর্যোগের। মর্তের জীবকুলের কথা ভেবে চিন্তায় পড়ে যান সমস্ত দেব দেবীরা। সে সময় ভগবান বিষ্ণু পৃথিবী ধ্বংস হবার ভয়ে, সেই প্রচন্ড প্রলয় থামাতে, সুদর্শন চক্র পাঠিয়ে দেন। সুদর্শন চক্র দ্বারা দেবী সতী মৃতদেহ ছেদন করেন। এতে সতী মাতার দেহখণ্ডসমূহ ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন জায়গায় পড়ে। শুধ ভারতবর্ষেই নয়, ববর্তমান আফগানিস্তান, বাংলাদেশ, নেপাল ও শ্রীলংকাতেও রয়েছে এই ৫১পিঠের অংশ। এই পবিত্র পীঠস্থান গুলিই ৫১টি শক্তিপীঠ হিসেবে পরিচিত। মানুষের বিশ্বাস অনুযায়ী, শক্তিপীঠ নামের তীর্থ স্থান গুলিতে দেবী দাক্ষায়ণী সতীর দেহের নানান অঙ্গ পাথরে পরিণত হয়ে রক্ষিত আছে। জলপাইগুড়ি জেলার ধূপগুড়ি ব্লকের গাদং ২ নং গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকার পুরনো শালবাড়িতে অবস্থিত এই ভ্রমরী দেবীর মন্দির। ধূপগুড়ি শহর থেকে মাত্র ৮ কিলোমিটার দূরে শালবাড়ি গ্রাম। ৩১ নং জাতীয় সড়কের পাশে অবস্থিত শালবাড়ি উচ্চ বিদ্যালয়ের খেলার মাঠের অদূরেই এই শক্তীপিঠ। পাশ দিয়ে বয়ে গেছে গিলান্ডি নদী। এই নদীর বাঁধ ধরেই অবস্থিত এই মন্দিরে। লোক মুখে কথিত আছে দেবী ভ্রমরীর কাছে মানত করলে, তার সুফল মিলবেই। এখানকার মানুষ মনে করেন সতীর বাম পা রয়েছে এই মন্দেরে।



বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, ৫১টি শক্তিপীঠের কথা বলা হয়ে থাকলেও, শাস্ত্রভেদে এই পীঠ গুলির সংখ্যা ও অবস্থান নিয়ে বহু মতভেদ আছে। যেমন পীঠনির্ণয় তন্ত্র নামক একটি গ্রন্থে শক্তিপীঠের সংখ্যা ৫১টি। আবার শিবচরিতগ্রন্থে ৫১টি শক্তিপীঠের পাশাপাশি ২৬টি উপপীঠের কথাও বলা হয়েছে। বাংলা পঞ্জিকা এবং আরো কয়েকটি ধর্ম গ্রন্থে উল্লেখ আছে ত্রিস্রোতা নদীর পাশে শালবাড়ি গ্রামে অবস্থিত ভ্রামরী দেবীর মন্দিরে আছে দেবীর বাম পদ। আবার আরও একটি সূত্র থেকে যানা যায় জলপাইগুড়ি জেলার বোদাগঞ্জেও রয়েছে দেবীর বাঁ পা। তাই এই নিয়ে রয়েছে প্রচুর তর্ক-বিতর্কও। তবে এখানে মন্দির গড়ে উঠলে শালবাড়িও হয়ে উঠতে পারে এক পবিত্র তীর্থ স্থান। তাই এবারের পূজো কমিটি আরও বেশি করে উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন মন্দিরের উন্নতির জন্য। পুজো কমিটির আরও এক সদস্য সুব্রত রায় জানান, হতে পারে এই মন্দিরের পুজো অত ধুমধাম করে হয় না, এখানকার কালি পুজোয় প্রতিবারই আয়োজন করা হয় পাঁঠা বলির, দেবী যেমন জাগ্রত তেমনি কঠোর নিয়ম নিষ্ঠার মধ্য দিয়ে করা হয় মায়ের পুজো। আমরা চাই রাজ্য সরকার এখানকার মানুষের ইচ্ছাকে সন্মান জানিয়ে ভ্রামরী দেবীর মন্দির নির্মাণে সহযোগিতা করুক। ধূপগুড়ির বিধায়ক মিতালী রায় বর্তমান প্রতিবেদক কে জানান, তিনি দেবীর এই শক্তিপীঠ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল। প্রচারের অভাবে এই মন্দিরটি সম্পর্কে অনেকেরই ধারণা নেই। অথচ সত্যিই এটি কালীঘাট বা কামাখ্যা হয়ে উঠতে পারত হয়ে উঠতে পারতো অন্যতম দর্শনীয় স্থান তথা পর্যটন কেন্দ্র। এলাকার জনগণ সমেত ধর্মপ্রাণ সাধারণ মানুষের এগিয়ে আসা উচিত এই মন্দিরটিকে সুন্দরভাবে গড়ে তোলার জন্য। তিনি মন্দির কমিটিকে আশ্বাস দিয়েছেন এই মন্দির নির্মাণে তিনি তাদের পাশে থাকবেন।

আপনাদের মূল্যবান মতামত জানাতে কমেন্ট করুন ↴

সবার আগে খবর পেতে , পেইজে লাইক দিন

আপনার পছন্দ

বিজ্ঞাপন
PMJOK

আরও খবর

বিজ্ঞাপন
PMJOK